মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ০৮:২৩ অপরাহ্ন

দেশপ্রেম আমার সাহস ও অনুপ্রেরণা: বিপ্লব কুমার সরকার

দেশপ্রেম আমার সাহস ও অনুপ্রেরণা: বিপ্লব কুমার সরকার

দেশপ্রেম আমার সাহস ও অনুপ্রেরণা: বিপ্লব কুমার সরকার

মোঃ রহমত উল্যাহ : ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার (অপারেশন) বিপ্লব কুমার সরকার। যিনি পুলিশের কাজের পাশাপাশি সামাজিক ও মানবিক কাজ করে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। অর্জন করেছেন ভালোবাসা। ১৯৭২ সালের ১৬ জুন কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার খড়মপট্টিতে জন্মগ্রহণ করেন পুলিশের এই সাহসী কর্মকর্তা। দৈনিক প্রতিদিনের কাগজকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে নিজের শৈশব জীবন, শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের নানা দিক নিয়ে কথা বলেন। পাঠকদের উদ্দেশ্যে সাক্ষাৎকারটি হুবহু তুলে ধরা হল।

প্রতিদিনের কাগজ : শুভ অপরাহ্ন। কেমন আছেন?
বিপ্লব কুমার সরকার: শুভ অপরাহ্ন। আমি ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?
প্রতিদিনের কাগজ : আমিও ভালো আছি। আপনার শৈশব-কৈশোর সম্পর্কে জানতে চাই।
বিপ্লব কুমার সরকার: শৈশব-কৈশোর কেটেছে আমার জন্মভূমি কিশোরগঞ্জ জেলার সদর উপজেলায়।
প্রতিদিনের কাগজ : আপনার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে বলুন।
বিপ্লব কুমার সরকার: উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত আমার শিক্ষাজীবন কিশোরগঞ্জে কেটেছে, এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদ বিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকত্তোর সম্পন্ন করি।

প্রতিদিনের কাগজ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। সেই সময়কার উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা বলুন, যা সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে।
বিপ্লব কুমার সরকার: ছাত্র রাজনীতির সময়ের উল্লেখ করার মত ঘটনা বললে- ছাত্র রাজনীতি করতে গিয়ে কারাবরণ করেছিলাম। এটি আমার কাছে একটি নেতিবাচক স্মরণীয় ঘটনা। আমি কোনো চোর বা অপরাধী ছিলাম না, কিন্তু ছাত্র রাজনীতি করার কারণে আমাকে কারাবরণ করতে হয়েছে। আমাকে ডিটেনশনে রাখা হয়েছিল, অর্থাৎ অন্য সাধারণ বন্দীদের মত আমার সাথে কেউ দেখা করতে পারবে না।
প্রতিদিনের কাগজ : কত সালে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন? এবং প্রথম কর্মস্থল কোথায় ছিল?
বিপ্লব কুমার সরকার: ২১ তম বিসিএস এর মাধ্যমে ২০০৩ সালে ১০ মে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী কমিশনার পদে যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবনে প্রবেশ করি।
প্রতিদিনের কাগজ : অন্য পেশায় না গিয়ে পুলিশ কেন হলেন?
বিপ্লব কুমার সরকার: আমার কাছে মনে হয়েছে, মানুষের জন্য সরাসরি কোনো উপকারমূলক কাজ করা যায়, বিপদে পাশে দাড়ানো যায়, সহায়তা করা যায়, এসকল বিচেনায় আমার কাছে মনে হয়েছে বাংলাদেশে পুলিশই একমাত্র সার্ভিস, যারা সরাসরি মানুষের যেকোনো বিপদে পাশে দাড়াতে পারে। এই কারণে আমি বিসিএস এ পুলিশ ফার্স্ট চয়েজ দিয়েছিলাম।
প্রতিদিনের কাগজ : কর্মজীবনে কোথায় কোথায় দায়িত্ব পালন করেছেন?
বিপ্লব কুমার সরকার: কর্মজীবনের শুরুতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মোহম্মদপুর জোনের সহকারী কমিশনার হিসেবে কাজ শুরু করি। পরে তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার এবং পদোন্নতি পেয়ে একই বিভাগের উপ-কমিশনার নিযুক্ত হই। এরপর রংপুরের পুলিশ সুপার হিসেবে বদলি করা হয়। রংপুর থেকে পুনরায় তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার হিসেবে বদলি করা হয়। এরপর পদোন্নতি পেয়ে ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্তি উপ-মহাপরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। সর্বশেষ বর্তমানে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার (অপারেশন) হিসেবে কর্মরত আছি।

প্রতিদিনের কাগজ : কর্মজীবনের স্মরণীয় একটি ঘটনা বলুন।
বিপ্লব কুমার সরকার: কর্মজীবনে তো অনেক ঘটনারই স্বাক্ষী। তবে যদি একটাই বলেন, তাহলে আমি বলবো- ২০১৩ সালের ৫ই মে শাপলা চত্বরে হেফাজত ইসলামের যে ঘটনা। যে অপারেশন করে তাদেরকে সেখান থেকে সরাতে হয়েছে। তখন আমি তেজগাঁও বিভাগের ডিসি অবস্থায় সেই অপারেশনের সদস্য ছিলাম। এটা আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা।
প্রতিদিনের কাগজ : কর্মজীবনে কি কি পদক ও পুরস্কার পেয়েছেন?
বিপ্লব কুমার সরকার: আমি দুইবার বাংলাদেশ পুলিশের সর্বোচ্চ পদক বিপিএম পেয়েছি। একবার পিপিএম পদক পেয়েছি। আর তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার থাকাকালীন আমার আমার বিভাগ ২৮ বার শ্রেষ্ট বিভাগ হয়েছে।
প্রতিদিনের কাগজ : ‘কারাগারের রোজনামচা’ বই নিয়ে আপনার একটি প্রতিযোগিতার উদ্যোগের কথা জানা যায়। একজন পুলিশ হয়েও বইটি নিয়ে এমন উদ্যোগের কারণ কি?
বিপ্লব কুমার সরকার: আমার একটা টার্গেট ছিল- বঙ্গবন্ধুর লেখা এই বইটি আজকের প্রজন্ম অর্থাৎ ছাত্র-ছাত্রীরা যদি না পড়ে, তাহলে তারা বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানতে পারবে না। তাই আমার একটা উদ্যোগ ছিল- অন্তত কিছু ছাত্র-ছাত্রীকে বইটি পড়াই। বঙ্গবন্ধুকে জানুক- এটাই ছিল আমার মূল উদ্দেশ্য।
প্রতিদিনের কাগজ : প্রতিযোগিতার জন্য কি কি উদ্যোগ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়েছিল?
বিপ্লব কুমার সরকার: আমাদের প্রতিযোগিতা ছিল- আমরা ১০০ টি প্রশ্ন উন্মুক্ত করে দিয়েছিলাম। বইটি পড়ে উত্তরগুলো খুঁজে বের করতে হবে। ওই সময় আমার বিভাগের কর্মকর্তারা অনন্য অসাধারণ কাজ করেছে। সাব-ইন্সপেক্টরগণ স্কুল-কলেজে গিয়ে-গিয়ে এটির প্রচারে কাজ করেছে। আমরা ফেইসবুকেও প্রচার করেছিলাম। ফলে তেজগাঁও বিভাগের বাহিরে থেকেও অনেকে অংশগ্রহণের আগ্রহ দেখায়। প্রায় ১২-১৪ হাজার শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছিল।

প্রতিদিনের কাগজ : প্রতিযোগিতাটি পরিচালনা করতে গিয়ে আপনার যে মূল উদ্দেশ্য- বইটি পড়ানো, সেটি পেরেছেন বলে মনে হয়েছে?
বিপ্লব কুমার সরকার: প্রতিযোগিতার সময় আমি একটি ফোন পেয়েছিলাম। একজন ছাত্রী ফোন করে বলতেছে- স্যার একটি প্রশ্নের উত্তর বইয়ের কোথাও পাচ্ছি না। ১৫ বার পড়েছি বইটি। আমরা বলেছি- উত্তর আছে। পড়ে বের করতে হবে। পরে সে আবার ফোন করে জানালো- বইটি ১৯ বার পড়ার সময় উত্তরটি পেয়েছে। তার মানে আমি যেটা চেষ্টা করেছিলাম, পড়ার আগ্রহটা জন্মানো। এই ফোন কল পেয়ে সেটা পেরেছি বলে মনে হয়েছে।
প্রতিদিনের কাগজ : সামাজিক বিভিন্ন কাজে আপনার সম্পৃক্ততার কথা শোনা যায়। কর্মব্যস্ততার মাঝেও সামাজিক কাজ নিয়ে কিছু বলুন।
বিপ্লব কুমার সরকার: আমি বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করতে বেশি পছন্দ করি। আরও বেশি পছন্দ করি সুবিধাবঞ্চিত ও পথশিশুদের নিয়ে কাজ করতে। কারণ- আমি আপনি পথশিশু হতে পারতাম। সৃষ্টিকর্তার কৃপায় আমি আপনি পথশিশু হইনি। কিন্তু ওরা হয়েছে, অনেক কিছু থেকে ওরা বঞ্চিত। তাই তাদের নিয়ে কাজ করতে ভালো লাগে।
প্রতিদিনের কাগজ : সুবিধাবঞ্চিতদের নিয়ে আপনার নিয়মিত চলমান কোনো কাজ আছে কি না?
বিপ্লব কুমার সরকার: আমি সুবিধাবঞ্চিত ও পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা ৩-৪ টা সংগঠনের সাথে কাজ করি। ওরা যখন যেটা চাই তখন সাপোর্ট দেওয়ার চেষ্টা করি।
প্রতিদিনের কাগজ : রংপুরের পুলিশ সুপার থাকাকালীন নারী ফুটবলারদের নিয়ে আপনার কিছু উদ্যোগের কথা জানা যায়। সে সম্পর্কে কিছু বলুন।
বিপ্লব কুমার সরকার: রংপুর সদরের পালিচড়া গ্রামে কিছু নারী ফুটবলার ছিল। তারা বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে বিভিন্ন পর্যায়ে খেলতো। নারী হয়েও ফুটবল খেলার কারণে সেখানে তারা কুসংস্কার ও বাধার মুখে পড়তে হয়েছে, ওই ফুটবলারদের পাশে দাড়িয়েছি। মানুষকে মোটিভেট করার চেষ্টা করেছি। প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছি।
প্রতিদিনের কাগজ : রংপুরের আহত দু’জন নারী ফুটবলারের চিকিৎসার জন্য আপনি পাশে দাড়িয়েছিলেন। কি উদ্যোগ নিয়েছিলন?
বিপ্লব কুমার সরকার: রংপুরে একটি টুর্ণামেন্ট খেলা অবস্থায় ভালো একজন খেলোয়াড়কে মাঠ থেকে উঠে যেতে দেখলাম। পরে জানতে পারলাম তার পায়ের লিগামেন্ট ছিড়ে গিয়েছিল। এরকম আরও একজনসহ দু’জনকে ঢাকায় এনে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও অপারেশনের উদ্যোগ নিই। আমার ব্যক্তিগত সহায়তার পাশাপাশি অনেকেও সহায়তা করে। দু’জনের একজন বর্তমানে সেনাবাহিনীতে রয়েছে।

প্রতিদিনের কাগজ : সেই নারী ফুটবলাররা বর্তমানে ভালো পর্যায়ে আছে। তাদের এখনকার সফলতা দেখে তাদের জন্য কিছু করতে পেরে আপনার ব্যক্তিগত অনুভূতি কেমন?
বিপ্লব কুমার সরকার: মানুষের জন্য ভালো কিছু করতে পারলে আমি আনন্দ পাই।
প্রতিদিনের কাগজ : কক্সবাজারে ছয় ভাইয়ের পরিবারের পাশে দাড়াতে কোন বিষয়টি আপনাকে উদ্বুদ্ধ করেছে?
বিপ্লব কুমার সরকার: তারা ছয় ভাই পিতার সৎকার শেষে রাস্তায় উঠতেই মর্মান্তিক মৃত্যুর মুখে পড়ে। একসাথে ছয় ভাইয়ের মৃত্যুর খবর আমাকে খুবই মর্মাহত করে। তাই আমি আমার সামর্থ অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা করেছি। এটা আমি মনে করেছি যে, মানবিকতার দিক থেকে সহায়তা করা উচিত।
প্রতিদিনের কাগজ : কর্মজীবনে কোন বিষয়টি সামনে এগুতে আপনাকে সাহস ও অনুপ্রেরণা দেয়?
বিপ্লব কুমার সরকার: আমি চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করি। মানুষ যখন কোনো একটি চ্যালেঞ্জ পার করে তখন সে আরেকটি চ্যালেঞ্জ নিতে উৎসাহ পায়। আমি আমার দেশকে ভালোবাসি- এটাই আমার সাহস ও অনুপ্রেরণা।
প্রতিদিনের কাগজ : প্রতিদিনের কাগজের পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।
বিপ্লব কুমার সরকার: প্রতিদিনের কাগজের পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলবো- পত্রিকা বা সংবাদপত্র সমাজের দর্পণ। সবাই পত্রিকা পড়েন, পত্রিকা পড়লে নিজেকে অনেক বেশি ঋদ্ধ করা যায়। আর সকলকে আমি বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানাই। সবাই যেন পুলিশকে সহায়তা করে। পুলিশের সংস্পর্শে এসে যদি কেউ প্রত্যাশিত সেবা না পায়, তখন যেন পুলিশের সমালোচনা করে।
প্রতিদিনের কাগজ : আপনাকে ধন্যবাদ প্রতিদিনের কাগজকে সময় দেওয়ার জন্য।
বিপ্লব কুমার সরকার: আপনাকেও ধন্যবাদ।

শেয়ার করুন

Comments are closed.




দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ © All rights reserved © 2025 Protidiner Kagoj |